কড়াইলের ভয়াবহ আগুনে সব পুড়লেও অক্ষত রইলো পবিত্র কুরআনের হরফ

মোঃ আমির হামজা
ঢাকা জেলা প্রতিনিধি

রাজধানীর কড়াইল বস্তিতে গত রাতে লাগা ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে মুহূর্তেই ভস্মীভূত হয়েছে শতাধিক ঘরবাড়ি, জ্বলেছে হাজারো মানুষের স্বপ্ন ও সংগ্রহের সম্পদ। কিন্তু ধ্বংসস্তূপের মধ্যেই ঘটে যায় এমন এক ঘটনা, যা উপস্থিত সবার মনে সৃষ্টি করে গভীর বিস্ময় এবং আবেগ। সম্পূর্ণ দগ্ধ হয়ে যাওয়া কক্ষ থেকে উদ্ধার করা কুরআনের পৃষ্ঠা ও কয়েকটি অংশ—চারপাশ কালো হয়ে ছাইয়ের মতো হলেও এর ওপর লেখা আরবি আয়াতের হরফগুলো প্রায় অক্ষত।

স্থানীয়দের কাছ থেকে জানা যায়, বুধবার রাত আনুমানিক ১১টার দিকে হঠাৎ করেই এক ঘর থেকে আগুনের সূত্রপাত ঘটে। কিছুক্ষণের মধ্যেই তা পাশের ঘরগুলোতে ছড়িয়ে পড়ে। কড়াইল বস্তির ঘরগুলো অধিকাংশই টিন, কাঠ ও প্লাস্টিকের তৈরি হওয়ায় আগুন ভয়াবহ রূপ ধারণ করে।
চিৎকার আর আতঙ্কে মানুষ যখন প্রাণ বাঁচাতে ঘর ছেড়ে বের হয়ে আসে, কোনো কিছু নেওয়ারও সুযোগ পায়নি অনেকেই। দগ্ধ হয়ে যায় তাদের সংগ্রহের শেষ সম্বলটুকুও।

ঘটনার খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের ৬টি ইউনিট দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে টানা প্রায় কয়েক ঘণ্টা চেষ্টা চালিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। ফায়ার সার্ভিসের এক কর্মকর্তা বলেন,
“আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছিল। ঘরগুলোর গঠন এমন যে কোনো কিছুই আগুনের তাপে টিকে থাকার কথা নয়।”
আগুনের কারণ প্রাথমিকভাবে বিদ্যুৎ সংযোগ থেকে শর্ট সার্কিট বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে পুরো বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।
ধ্বংসস্তূপে ‘অলৌকিক’ দৃশ্য
আগুন নিভে যাওয়ার পর স্থানীয় বাসিন্দা ও ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা যখন ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ দেখতে শুরু করেন, তখন আবিষ্কৃত হয় পুড়ে যাওয়া একটি কুরআনের কপি। আশেপাশের কাঠামো, মলাট, কাগজ সব দগ্ধ হয়ে গেলেও আয়াতগুলো স্পষ্টভাবে পড়া যাচ্ছিল।
কাছেই থাকা আরেকটি পুড়ে যাওয়া প্রতিলিপি থেকেও কিছু আয়াত অক্ষত অবস্থায় পাওয়া যায়। ঘটনাস্থলে উপস্থিত প্রত্যক্ষদর্শীদের অনেকেই চোখের জল ধরে রাখতে পারেননি।
স্থানীয় দোকানি (জাকির)বলেন,
“আমার ঘর, জিনিস—সব শেষ। কিন্তু আগুনে অক্ষত কুরআনের লেখা দেখে মনে হয়েছে আল্লাহ এখনও আমাদের দিকে তাকিয়ে আছেন।
ক্ষতিগ্রস্তদের আর্তনাদ
এই অগ্নিকাণ্ডে প্রায় ১২০টিরও বেশি পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে জানা গেছে। অনেকেই নিজেদের নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী, নথি—এমনকি শিশুর পড়াশোনার বই পর্যন্ত হারিয়েছেন।
বাড়িঘর হারানো এক বাসিন্দা বলেন,
“কীভাবে চলব জানি না। বাচ্চাদের খাবার নেই, পোশাক নেই। কিন্তু আমরা বেঁচে আছি—এটা বড় কথা।”

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রতিনিধি জানিয়েছেন, অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য জরুরি খাদ্য এবং প্রয়োজনীয় সামগ্রী বিতরণ করা হচ্ছে। পাশাপাশি স্থানীয় প্রশাসন আশ্রয়কেন্দ্র এবং অস্থায়ী চিকিৎসা সহায়তার উদ্যোগ নিয়েছে।
সমাজজুড়ে প্রতিক্রিয়া
ঘটনার ছবি ও ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে তাৎক্ষণিকভাবে হাজারো প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। অনেকেই বলেন,
“কুরআনের হেফাজত আল্লাহ নিজেই করেন—এই ঘটনা তার প্রমাণ।”
অন্যদিকে, কিছু গবেষক মনে করেন, বইয়ের কাগজ, কালির ধরন অথবা বাঁধাইয়ের প্রকৃতি এমন হতে পারে যা আগুনে লেখা অংশকে তুলনামূলকভাবে বেশি সুরক্ষিত রাখে। তবুও ধর্মীয় বিশ্বাসীদের কাছে এই ঘটনাটি এক আত্মিক বার্তা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *